করোনা ভাইরাস: প্রথম শনাক্তের পাঁচ মাস, সংক্রমণের হার এখনও কেন ঊর্ধ্বমুখী

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পাঁচ মাস হয়েছে আজ। এই পাঁচ মাসে শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সংক্রমণের হার এখনও ঊর্ধ্বমুখী আছে।

এদিকে ঈদকে কেন্দ্র বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা আগের চাইতে কমে যাওয়ার কারণে সামনে দিনগুলোয় রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংক্রমণ কেন বাড়ছে?

সম্প্রতি বাংলাদেশের ফুটবল দলের ২৪ জন খেলোয়াড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ১৮ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। যা প্রায় ৭৫%। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলেন, যারা খেলাধুলা করেন তাদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।

এমন একটি ফুটবল টিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যদি এমন চিত্র বেরিয়ে আসে তাহলে পুরো দেশে ঢালাওভাবে পরীক্ষা হলে সংক্রমণের চিত্র কেমন হবে সেটা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো তো হয়নি বরং আগের চাইতে এই হার প্রায় ২৬% কমেছে। সে কারণে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যাও কম আসছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তাক হোসেন।

তবে এটি সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র নয় বলে তিনি জানান।

নমুনা পরীক্ষা কমে যাওয়ার পেছনে চারটি কারণ তুলে ধরেছেন তিনি।

প্রথমত, বাংলাদেশের বিশাল জনপদ বন্যার কবলে পড়ায় সেখানে নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে ফি আরোপ করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, নমুনা পরীক্ষা না করেই ভুয়া ফলাফল প্রকাশের নানা অভিযোগ উঠে আসায় মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে।

চতুর্থত, মানুষের মধ্যে আগের মতো উদ্বেগ নেই। কেউ নমুনা পরীক্ষাকে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চাইছেন না।

বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে ধারণা পেতে সক্রিয়ভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেইসঙ্গে কিছু দূর পর পর বুথ করে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন মি. হোসেন।

তারপরও যে সীমিত হারে পরীক্ষা হচ্ছে সেখানে এখনও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বিগত মাসগুলোয় নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে শনাক্তের হার ছিল চার শতাংশ থেকে কুড়ি শতাংশের মধ্যে। কিন্তু এখন এই হার বেড়ে গড়ে ২০ থেকে ২৪ শতাংশের মতো আসছে।

মি. হোসেন, বলেন, এই ঊর্ধ্বমুখী হার নির্দেশ করে যে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

সরকার দুষছে সাধারণ মানুষকে
এদিকে পাঁচ মাসেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে মানুষের অসচেতনতাকেই দুষছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে কোরবানির ঈদে বিপুল সংখ্যক মানুষের এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ভ্রমণ, পশুর হাটে জমায়েত এক কথায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে মানুষের মাছে গা ছাড়া ভাব চলে আসায় সামনের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণের গ্রাফ আবারও ওপরের দিকে উঠে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

মিসেস সুলতানা বলেন, “আমরা বার বার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলছি। কিন্তু জনগণের মধ্যে সচেতনতা একদমই নেই। মানুষ যদি ব্যক্তি পর্যায়ে মেনে না চলে তাহলে এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা আসলেও কঠিন।”

আগে ব্যবস্থাপনা তারপর কড়াকড়ি
তবে সাধারণ মানুষকে ঢালাওভাবে দোষারোপ না করে মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সেরকম ব্যবস্থাপনা তৈরি করা এরপর স্বাস্থ্যবিধি তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তাক হোসেন।

তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ, সিটি কাউন্সিলর, গ্রাম কাউন্সিলর, স্বেচ্ছাসেবক তাদের উচিত হবে আগে সাধারণ মানুষকে মাস্ক বিতরণের করা, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কিভাবে কাজ করা যায় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া। এরপরে কেউ না মানলে তাদেরকে জরিমানার ভয় দেখানো যেতে পারে। নিয়ম মানার জন্য মানুষকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে শুধু দোষ চাপিয়ে লাভ নেই।”

এছাড়া যাদের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে বা যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে ঝুঁকির মধ্য আছেন তাদের নিয়মিত ফলোআপ করতে স্বাস্থ্য বিভাগকে তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

“যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা আইসোলেশনে আছেন কিনা, তাদের হাসপাতালে যেতে হবে কিনা। যারা আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছেন বা ঝুঁকিতে আছেন তারা কোয়ারেন্টিন পালন করছেন কিনা, সেগুলোর কোন ফলোআপ হচ্ছে না। এভাবে পরিস্থিতি কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে?”।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলা অনুযায়ী কোন দেশে যদি পর পর তিন সপ্তাহ নতুন রোগী শনাক্তের হার নিম্নমুখী থাকে তাহলে ধরে নেয়া হয় ওই দেশটিতে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংক্রমণের হার পাঁচ মাস ধরেই ঊর্ধ্বমুখী।

তবে সরকার যদি এখন থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে তাহলে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরুতে যেসব দেশ আক্রান্ত হয়েছিল বিশেষ করে চীন ও ইতালিতে সংক্রমণ শুরু হওয়া থেকে সর্বোচ্চ শিখরে উঠে আবার নেমে যেতে সময় লেগেছিল তিন থেকে চার মাস। কিন্তু বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে খুব ধীর প্রবণতা দেখা গেছে।

এমন অবস্থায় শনাক্তের সংখ্যার হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তালিকায় বর্তমানে ১৫তম স্থানে উঠে এসেছে। সূত্র : বিবিসি বাংলা।