শুধু ‘গোমাতা’ নয়, বিদেশি ‘আন্টি গরু’র দুধেও থাকে সোনা, বলছে গবেষণা

গরুর দুধে সোনা! সত্যি?

বেমক্কা মন্তব্য করে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। গরুর দুধে নাকি সোনা আছে। কুঁজে স্বর্ণনাড়ি।







বিদেশি গরু আন্টি। এখানের হাম্বা গরুর দুধ সেরা। সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি মিডিয়ায় হইচই। প্রিন্ট মিডিয়াতেও হাস্যরোল। মিমে ভরে যাচ্ছে ফেসবুক। সত্যিই তো নেহাতই আজগুবি তত্ত্ব!







কিন্তু বেমক্কা এমনি কথা কেন? সত্যি মিথ্যে খুঁজতে খুঁজতে কিছু তথ্য এল হাতে। তার থেকে দিলীপ ঘোষের বক্তব্য অবশ্যই একশো শতাংশ প্রমাণ হয় না। কিন্তু এরমধ্যে রয়েছে শাস্ত্রকথাও। কীরকম?







২০০৫ সালে পোলিশ জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজের একটা রিপোর্ট পাচ্ছি। “The content of Microelements and Trace Elements in Raw Milk from Cows in the Silesian Region” শীর্ষক রিপোর্ট খানিকটা এই ধরণের কথাই বলছে। মধ্য ইউরোপের সিলেসিয়া অঞ্চলের বেশিরভাগটাই পোলান্ডের মধ্যে পড়ে।







তাই এই উচ্চ সিলেসিয়া আর নিম্ন সিলেসিয়া অঞ্চলের গরু আর সেই গরুর দুধের মধ্যে থাকা খনিজের পরিমাণ, ব্যবধান নিয়ে গবেষণা। দেখা গিয়েছে অঞ্চল ভেদে গরুর দুধের প্রভাব রয়েছে। ফলে দিলীপ বাবুর ‘আন্টি গরু’ আর ‘হাম্বা গরু’র দুধে পার্থক্য অসম্ভব কিছু না। আর এই রিপোর্টেই, গরুর দুধে ১৬টি খনিজের মধ্যে রয়েছে অরাম বা সোনা।







এখন শুধু গরু নয়। অনেক প্রাণীর দেহেও সোনা মেলে। ৯৮ সালে জন এমসলের লেখা গবেষণাপত্রে মানুষের শরীরেও সোনার অস্তিত্ব দেখানো হয়েছে। ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষের শরীরে ০.২ মিলিগ্রাম সোনা রয়েছে বলে দাবি বিজ্ঞানীর।







তবে এতে অবশ্য গরুর শরীরে ভরপুর সোনা আর তা থেকে স্বর্ণবর্ণা দুধের যুক্তি দাঁড় করানো যায় না। কিন্তু সোনা যে আছে, তা ঠিক। এবং তা প্রাকৃতিক কারণেই। ফলে বক্তব্য পুরোটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এবার আসা যাক স্বর্ণনাড়ির প্রসঙ্গে।







এটা স্রেফ শাস্ত্র কথা। দিলীপ বাবুর মনগড়া গপ্পো মোটেই নয়। সেখানে একে বলা হচ্ছে সূর্যকেতু নাড়ি। ওই সূর্য থেকে কুঁজ হয়ে সোনা তৈরির যে বক্তব্য, সেটাই রয়েছে প্রাচীন শাস্ত্রে। গরুর কুঁজের মধ্যে দিয়ে নাকি গিয়েছে এই সূর্যকেতু নাড়ি। যার সঙ্গে সূর্যের সরাসরি সংযোগ। শাস্ত্রমতে সেই কারণেই ঘি, মাখন ও দুধ স্বর্ণরঙা।







এই রঙ নিয়ে বিজ্ঞান অবশ্য বলে বিটা ক্যারোটিনের কথা। গরু যেহেতু ঘাস-খড় খেয়ে থাকে, সেখান থেকে বিটা ক্যারোটিনের জেরে এই রঙ। যাইহোক বিজ্ঞান-শাস্ত্রের দ্বন্দ্ব চলতে থাকুক। দিলীপ ঘোষ এখানে শাস্ত্রকথা শুনিয়েছেন। এই কথা নতুন কিছু না। আদৌ সূর্যকেতু নাড়ি বা দিলীপ বাবুর স্বর্ণনাড়ির অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে।







এবার হাম্বা গরু আর আন্টি গরুর দুধের গুণগতমানের প্রশ্ন। ভারতীয় কুঁজওয়ালা গরুর দুধ নিঃসন্দেহে গুণগতভাবে অনেক উন্নত। বিশেষ করে গুজরাটের গিরের গরুর নামডাক অনেক। উন্নত দেশগুলিতেও এখন কুঁজওয়ালা গরুর চাহিদা বাড়ছে। এখানেই আসে A1 এবং A2 দুধের তুলনা। ভারতীয় গরুর দুধ A2 পর্যায়ের।







দুই রকম দুধে বিটা কেসিনের তারতম্য রয়েছে। A1 বিটা কেসিন হজমের সময় বিটা ক্যাসামরফিন-৭-এর মতো ওপিওয়েড পেপটাইড নিঃসৃত হয়, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে একটু ক্ষতিকর বলেই অনেকে মনে করেন। হজমেও গোলমাল হয়। এই কারণেই কুঁজওয়ালা গরুর A2 দুধের চাহিদা বেড়েছে। আর এই নিয়ে বিস্তর রাজনীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে। কেথ উডফোর্ডের Devil in the Milk বলে একটা বইও আছে এই নিয়ে।







দেশী গরু বলতে কিন্তু বস ইন্ডিকাসের কথাই এখানে বলছি। হাইব্রিড জার্সি গরু নয়। জার্সি গরু দুধ দেয় বেশি। ভারতের দুগ্ধ বিপ্লব এই ডেয়ারি শিল্পে অনেক হিসেব পাল্টে দিয়েছে। ব্যবসা বেড়েছে যত, তত গরুর আভিজাত্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে এক শ্রেণির। মিল্ক পলিটিক্স আর বিজনেসের ঝামেলা নিয়ে না হয় আরেকদিন লেখা যাবে।







কিন্তু এটা বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই ঠিক, দিলীপ ঘোষের হাম্বা গরুর দুধের মান বেশি। এখন এটা ওই সূর্য, সোনা আর স্বর্ণ নাড়ির দৌলতে কি না সে ভাবার বিষয়। আর জায়গা আর পরিবেশগত প্রভাবে গরুর কুঁজে কেমিক্যাল লোচার বিষয়টিও খুব একটা অবৈজ্ঞানিক নয়।







গরু নিয়ে বিজেপি শিবিরের ‘বাড়াবাড়ি’ অনেকেই ভাল চোখে দেখেন না। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এই গরুই কিন্তু প্রাচীন ভারতের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। আর এখনও গরু যথেষ্ট অর্থকরী পশু। আসলে দুম করে প্রাচীন শাস্ত্রের কথা তুলে আনলে একটু তো কানে বাজবেই..