মৃ’ত মেয়েটিকে তিনবার ধ’’ র্ষ’ ণ না করলেও চলতো!

ঢাকার কলাবাগান থা’না এলাকায় ইংরেজি মাধ্যমের এ লেভেলের ছা’ত্রী আনুশকা নুর আমিনকে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এখন তুঙ্গে। বাংলাদেশের মানুষ সব সময় কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসেন। আপাতত সেই ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আনুশকা নূর আমিনের মৃ’ত্যুর ঘটনা। পু’লিশ, ডাক্তার, আ’দালত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এই মহাযজ্ঞে আনন্দের সাথে যোগদান করছেন। রাষ্ট্রের ছোট ক’র্তা, বড় ক’র্তা, মাঝারি ক’র্তা সবাই মতামত দিচ্ছেন। প্রজারাও বাদ যাচ্ছেন না।

আনুশকার সাথে তার বন্ধু দিহানের কী’ স’ম্পর্ক ছিল তা কিছুটা অনুমান করা যায়। বাংলাদেশে ধ’’ র্ষ’ ণের একটি সংজ্ঞা দেয়া আছে। মেডিকেল সাইন্সে Forensic Medicine সাবজেক্ট যখন আমাদের পড়ানো হতো তখন থেকেই আম’রা সেই সংজ্ঞা ঠোঁটস্থ করেছি, আত্মস্থ করেছি।

সাধারণ মানুষ সেই সংজ্ঞা না জানলেও, ডাক্তার, পু’লিশ এবং আ’দালত তা নিশ্চয়ই জানেন বা জানা উচিত। সেই সংজ্ঞাকে যদি আম’রা বিশ্লেষণ করি তাহলে আনুশকার ঘটনাটিকে ধ’’ র্ষ’ ণ বলা একটু কঠিন। আমি সেই বিশ্লেষণে এখন যাচ্ছি না। ধ’’ র্ষ’ ণ হয়েছে কিনা তা ফরেনসিক পরীক্ষা, পু’লিশ এবং আ’দালতের শুনানি এবং রিপোর্টে পরিষ্কার হবার কথা। রায়ের আগে সবগুলো ব্যাপার গো’পনীয়ভাবে হবার কথা। চূড়ান্ত মতামত জানার জন্য আমাদের আ’দালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের সেই ধৈর্য নেই। আমাদের ক’র্তাব্যক্তিরা নিজস্ব উদ্যোগে মতামত দিয়ে চলেছেন। আনুশকা ধ’র্ষি’তা হয়ে মৃ’ত্যুবরণ করেছে একবার। আর মা’রা যাবার পর মেয়েটিকে এবং মেয়ের পরিবারটিকে মোট কয় বার ধ’’ র্ষ’ ণ করা হয়েছে?

আনুশকা হ’ত্যাকা’ণ্ডের এবং তথাকথিত ধ’’ র্ষ’ ণের একটি রগরগে বর্ণনা দিয়েছেন আমাদের পু’লিশ বিভাগ। মৃ’ত মেয়েটিকে প্রথমবার ধ’’ র্ষ’ ণ করা হলো। সেই সাথে তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধবীদের মান সম্মানকে ধ’’ র্ষ’ ণ করা হলো। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন কি এই ধ’’ র্ষ’ ণকে সম’র্থন করে? মেয়েটি ধ’র্ষি’তা হয়ে অথবা অ্যাডভেঞ্চারে গিয়ে মৃ’ত্যু বরণ করেছে। কিন্তু ম’রে গিয়েও মেয়েটি আবারও ধ’র্ষি’তা হচ্ছে। তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবরাও একই সাথে ধর্ষিত হচ্ছে।

যে ডাক্তার প্রাথমিক ময়নাত’দন্ত করেছেন তিনি ধ’’ র্ষ’ ণের একটি গ্রাফিক বর্ণনা দিয়েছেন। মিডিয়াকে ডেকে এনে চ’মৎকার ব্রিফিং করেছেন! ধ’’ র্ষ’ ণের আলামত থেকে শুরু করে ধস্তাধস্তির কোন প্রমাণ আছে কিনা তাও তিনি বলেছেন। আনুশকা ওখানে আবার ধ’র্ষি’তা হয়েছে। তার সাথে তার পরিবারও ধ’’ র্ষ’ ণের শিকার হয়েছে। ফরেনসিক মেডিসিনের রিপোর্ট হবে গো’পনীয়। সেই গো’পনীয় রিপোর্ট আ’দালতে যাবে। আ’দালতে শুনানি হবে। তারপর সিদ্ধান্ত হবে আসলেই ধ’’ র্ষ’ ণ কার্য সংগঠিত হয়েছে কিনা। বাংলাদেশে কি এই আইন চালু আছে? ফরেনসিক ডাক্তারকে কে এই অধিকার দিয়েছে যে, তিনি মিডিয়াকে ডেকে এনে ধ’’ র্ষ’ ণের আলামতের বর্ণনা দেবেন? বাংলাদেশে কি ব্যক্তি বা পরিবারের গো’পনীয়তা বলতে কিছু নেই? সবকিছু উদোম?

মৃ’ত মেয়েটিকে তৃতীয়বার ধ’’ র্ষ’ ণের মহান কাজটি সম্পাদন করেছে আমাদের কিছু মিডিয়া! মানুষকে বিনোদন দেবার জন্য কিছু কিছু মিডিয়া মেয়েটিকে নিয়ে অনেক কাহিনী ছাপিয়েছে। পরিবারের পরিচয় প্রকাশ করেছে। মেয়েটির ছবি প্রকাশ করেছে। কোথায় র’ক্ত পাওয়া গেছে, বিছানার চাদর বা সোফায় শারীরিক স’ম্পর্কের আলামত পাওয়া গেছে- সেই খবরও কোন কোন মিডিয়া প্রকাশ করেছে। মৃ’ত আনুশকার ধ’’ র্ষ’ ণ কার্য আবার সম্পাদিত হয়েছে। আমি যতদূর জানি যে বাংলাদেশে এই ধরনের একটি আইন রয়েছে যে ধ’র্ষি’তা মেয়ের ছবি বা পরিচয় পত্রিকায় বা মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না। কে শুনে কার কথা? শুধু ছবি প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলগুলো। পরিবারের চৌদ্দগুষ্টির খবর পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। কী’ তামাশার ব্যাপার!

আনুশকা ধ’’ র্ষ’ ণ এবং হ’ত্যাকা’ণ্ডের খবরের মাঝখানে আমাদের এক বড় পদের শাহেনশাহ নতুন একটি প্রশ্ন করেছেন। তিনি আনুশকার মা-বাবাকে প্রশ্ন করেছেন, ছে’লেমেয়েরা কোথায় যায় এই খবর যদি না রাখতে পারেন তাহলে তাদের জন্ম দিয়েছেন কেন? খবরটি পড়ে আমা’র চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। বাচ্চা জন্ম দেয়ার নতুন এই শর্ত বাংলাদেশ কখন চালু হয়েছে? এই শাহেনশাহ কি সরকারের কর্মক’র্তা? জনগণ কি ট্যাক্সের টাকা দিয়ে এই রাজপুত্রকে তাদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নিয়োগ দিয়েছে? সম্ভবত ওনার খেয়াল ছিল না। বাংলাদেশ কথা বললে সেই কথার জন্য কোন ট্যাক্স দিতে হয় না এবং পরিণতি ভোগ করতে হয় না। সেজন্যই আমাদের কথাগুলো লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতার আশেপাশে থাকলে আপনার ক্ষমতা অসীম। আপনি যা ইচ্ছা তা বলতেই পারেন। যা ইচ্ছা তা করতে পারেন।

কোন মা-বাবাই চায়না তাদের ছে’লেমেয়েরা এভাবে মৃ’ত্যুবরণ করুক। কোন মা-বাবাই চায়না তাদের ছে’লেমেয়েরা তাদের পরিবারের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠুক। তারপরেও ঘটনা-দুর্ঘ’টনা ঘটে যায়। আম’রা বলতে পারি কিছুটা হলেও মা-বাবাকে তার দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই? ট্যাক্স দিয়ে যাদের মাসিক বেতন আম’রা সরবরাহ করি তাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই? কেউ কেউ বলতে পারেন যে পিতা-মাতারা তাদের দায়িত্ব সেভাবে পালন করেননি। কিন্তু তাই বলে তাদেরকে সমাজে প্রকাশ্যে মানহানি করার অধিকার নিশ্চয়ই পু’লিশ, মিডিয়া বা ডাক্তারের নেই। ১৮ বছর হয়ে গেলে সেই সন্তানের দায়-দায়িত্ব কি মা-বাবার উপর চাপানো যায়?

বাংলাদেশের যে রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে একটি মেয়ের গ্রুপ স্টাডির কথা বলে ছে’লে বন্ধুর বাসায় সময় কা’টানোকে অনেকেই মানতে চাইবেন না। বাংলাদেশের ধ’র্ম-সমাজ-সংস্কৃতি এই ব্যাপারটিকে সম’র্থন করবে না। সে কারণে অনেকেই সেই ছে’লে মেয়ের অ’ভিভাবক দের উপর হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। তাদের সেই রাগের যৌক্তিকতা আছে। তবে কি’শোর-কি’শোরী তরুণ-তরুণীদের মনের খবর যারা রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন এই সময়ে তারা প্রচুর অনুকরণ ও অনুসরণ করে। বাংলাদেশের নাট’ক সিনেমায় এ ধরনের দৃশ্য দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই কি’শোর-কি’শোরীরা সেই নাট’ক এবং সিনেমা’র কাহিনী গুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এর দায় দায়িত্ব নেবে কে? যারা এই কাজকে নাট’ক সিনেমায় সম’র্থন করছেন তারাই আবার উল্টা বলছেন ধ’র্ষ’ককে ফাঁ’সি দেয়া হোক। তাদের কাছে আমা’র প্রশ্ন, যদি প্রমাণিত হয় (আমা’র ব্যক্তিগত অ’ভিমত) আইনের সংজ্ঞায় যাকে ধ’’ র্ষ’ ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে তা আসলে এ ক্ষেত্রে ঘটেনি এবং মেয়েটি নিরেট অ্যাডভেঞ্চারে গিয়ে মা’রা পড়েছে তাহলে তারা কী’ করবেন? যদি প্রমাণিত হয় দুজনের সম্মতিতে এ ধরনের কর্ম সম্পাদিত হতে গিয়ে হঠাৎ করে একজনের মৃ’ত্যু হয়েছে তাহলে উনারা কী’ বলবেন? যারা এই কাজগুলোকে প্রমোট করেছেন তাদের বক্তব্য জানার বড় ইচ্ছে। তখন কাকে ফাঁ’সি দেবার জন্য উনারা দাবী করবেন?

যে মেয়েটি মা’রা গেছে সে তো কারো সন্তান। পরিণত বয়সি সন্তান। মেয়েটিকে কী’ভাবে মা’রা গেছে তা নির্ধারণের দায়িত্ব আ’দালতের ওপর আছে। আ’দালতের চূড়ান্ত রায় আসার আগে মৃ’ত মেয়েটিকে আর ধ’’ র্ষ’ ণ করবেন না। এই ছে’লে এবং মেয়ের পরিবারের অধিকার আছে বেঁচে থাকার। তাদেরকে বাঁচতে দিন। মৃ’ত মেয়েটিকে ধ’’ র্ষ’ ণের সাথে সাথে তাদের পরিবারকে ধ’’ র্ষ’ ণ করবেন না। যদি আপনাদের রাগ প্রকাশ করতেই হয় তাহলে যে বা যারা এ ধরনের কাজকে বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রমোট করছেন তাদেরকে জবাবদিহিতার অধীনে নিয়ে আসুন।