যে তিন কারণে হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে ভারত

১২ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানোর দিনই পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি ব’ন্ধ ঘোষণা করেছে ভারত। হঠাৎ করে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি ব’ন্ধের এমন ঘোষণায় বি’পাকে পড়েছে বাংলাদেশ। অ’স্থি’র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার। প্রশ্ন উঠছে ভারত হঠাৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল।

কিছুদিন আগে প্র’ব’ল বৃষ্টিতে ভে’সে গিয়েছিল কর্ণাটক রাজ্য। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে ক্ষে’তের সব পেঁয়াজ। ফলে যে পেঁয়াজ এখন বাজারে আসার কথা ছিল, তা আসেনি। বৃষ্টিতে একইভাবে পেঁয়াজের ক্ষ’তি হয়েছে মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটের মতো রাজ্যেও। বৃষ্টি আরেকটা ক্ষ’তি করেছে। গুদামে রাখা পেঁয়াজে পানি ঢু’কে গেছে। ফলে সেই পেঁয়াজও প’চেছে।

ফলে যে পেঁয়াজ এখন পাইকারি বাজারে ১৫ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, মহারাষ্ট্রে তা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। মহারাষ্ট্রের বাইরে আরো বেশি দামে। মহারাষ্ট্রকে বলা হয় ভারতের পেঁয়াজভা’ণ্ডার। সবচেয়ে বেশি ও ভালো মানের পেঁয়াজ উৎপাদন হয় এখানে। ফলে সেখানে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা কেজি ছাড়ানোর পরেই সোমবার পেঁয়াজ রপ্তানি ব’ন্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

কলকাতায় পেঁয়াজের একজন বড় আড়তদার জয়ন্ত ঘোষ। তিনি বলেছেন, ”বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা প্রচুর; কিন্তু জোগান কম। বৃষ্টি ও বন্যা তার একটা কারণ ঠিকই, ল’কডা’উনও বড় কারণ। ল’কডা’উনের সময় মাঠে ফসলের কাজ করার লোক ছিল না। ফলে উৎপাদন অনেক কম হয়েছে। যা হয়েছে, সেটাও ঠিকভাবে বাজারে নিয়ে আসা যায়নি। তাই এখন যে অবস্থা হয়েছে, তাতে লকডাউনের কথাটা ভুলে গেলে হবে না।”

দিল্লির পেঁয়াজ বিক্রেতা বিনীত জানাচ্ছেন, ”বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা বেশি, জোগান কম। গত মে মাস থেকে এই গল্প চলছে। পেঁয়াজ উৎপাদনে মরারাষ্ট্রের পর আছে কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলো। সেখানে বর্ষায় ফসল ন’ষ্ট হয়েছে। পরের ফসল উঠবে নভেম্বরে। তাই পেঁয়াজের এত দাম। দিল্লিতে আজ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে।”

তাই বলে আচ’মকা পেঁয়াজ রপ্তানি ব’ন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ রিপো’র্ট হলো, রপ্তানি চালু থাকলে আর এক-দুই মাসের মধ্যে পেঁয়াজের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা হয়ে যেত। এই রিপো’র্ট পাওয়ার পর আর অপেক্ষা করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। সামনেই বিহার নির্বাচন। তখন দাম ৮০ টাকা কেজি হলে খো’সাসর্ব’স্ব পেঁয়াজই বিজেপি-জেডিইউ জোটকে কাঁ’দিয়ে ছাড়ত।

পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা কেজি হওয়ার পর দিল্লিতে ক্ষ’মতা হা’রাতে হয়েছিল বিজেপিকে। তারপর ১৫ বছর কংগ্রেসের শীলা দীক্ষিত এবং প্রায় ছয় বছর অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লি শা’সন করছেন। বিজেপি আর ফিরে আসতে পারেনি। পেঁয়াজ যে কতটা কাঁ’দাতে পারে তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন দিল্লি বিজেপির নেতারা। তাই বিহারের কথা ভেবে পেঁয়াজের দাম কম রা’খতে প্রয়োজনে তা আমদানি করবে মোদি সরকার; কিন্তু দাম আর বাড়তে দেবে না।

প্রবীণ বিজনেস রিপোর্টার জোসেফ জানিয়েছেন, ”বিহারের নির্বাচনের জন্যই হঠাৎ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক সময় হলে হয়তো এখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না। আরেকটু অপেক্ষা করে দেখা হতো।” কিন্তু রপ্তানি নিষে’ধা’জ্ঞা জারি করা ছাড়া কি অন্য পথ ছিল না?

নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিজনেস এডিটর জয়ন্ত রায় চৌধুরি বলেন, ‘সরকারের উচিত ছিল সরকারি কৃষি বিপণন সংস্থা নাফেডের হাতে থাকা পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া। সেই সঙ্গে পেঁয়াজের মজুদদারদের বি’রু’দ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তা হলেই বাজারে পেঁয়াজ আসত। দামও কম থাকত। তা না করে সহজ পন্থা নিয়ে রপ্তানি ব’ন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল তারা।’

এই সিদ্ধান্তে মহারাষ্ট্রের নেতারা ক্ষু’ব্ধ। সাবেক কৃষিমন্ত্রী এবং সারা দেশে কৃষি নিয়ে যার অগা’ধ জ্ঞানের কথা সবাই স্বী’কার করেন, সেই শারদ পাওয়ার টুইট করে বলেছেন, ”রপ্তানি বন্ধ করার হঠাৎ সিদ্ধান্ত ভারতের ভাবমূর্তিতে বড় আ’ঘা’ত। আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের রপ্তানিকারী হিসাবে ভারতের ভাবমূর্তি ধা’ক্কা খেল। সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের সুবিধা হবে। পাকিস্তান প্রচুর পেঁয়াজ রপ্তানি করবে।”

এর আগে ভারত সফরে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুরোধ করেছিলেন, ”আপনারা পেঁয়াজ রপ্তানি ব’ন্ধ করলে আগে থেকে জানাবেন। না হলে বাংলাদেশ খুব অসুবিধার মধ্যে পড়ে। আগে থেকে জানলে সরকার আগাম কিছু ব্যবস্থা নিতে পারে।’ কিন্তু আবারও হঠাৎ করেই রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল ভারত। শেখ হাসিনাও সম্ভবত আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেলেন না। সূত্র : ডয়েচে ভেলে।