কে এই লোক শামীম ওসমানকে ধমক দেয়!

২০০১ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ১৯ বছর। এই ১৯ বছর পরে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান জানালেন, চাষাড়া আওয়ামী লীগ অফিসে ২০০১ সালের ১৬ জুন বোমা হামলার সাথে বিএনপির নেতারা জড়িত নন।

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার পরে যখন ওবায়দুল নামের একজনকে থানায় আটক করে নিয়ে যায় তখন থানার ওসির ড্রয়ারে একটি শক্তিশালী বোমা পাওয়া জানিয়েছেন ওই হামলায় আহত শামীম ওসমান।

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার মামলায় সাক্ষ্য দিতে প্রথমবারে মত আদালতে এসে সেই দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন সেই ঘটনায় আহত শামীম ওসমান। মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের সময়ে ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য প্রদান শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন শামীম ওসমান।

শামীম ওসমান বলেন, চাষাঢ়ার পাশেই মিশনপাড়া এলাকার ওবায়দুল সঙ্গে ছোটকাল থেকেই আমার পরিচিত। তার কোলেও উঠেছিল। ২০০১ সালের ১৬ জুন বিকেলে চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে এসেছিলেন ওবায়দুল। এসে বলেছিলেন যে তার ছেলে ও মেয়েরা আমেরিকা যাবে আমি যেন কাগজে সুপারিশ করে দেই। কিন্তু আমি তখন হাতের সেই আবেদন পড়ে দেখলাম ইংরেজীর অনেক ভুল।

তাছাড়া আমাদের সাক্ষরে এভাবে ভিসা হয় না। আমাদেরকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি নিয়ে ভিসার আবেদন করতে হয়। আর এ ধরনের ভুল আবেদন দেখলে ভিসা এম্বেসী আমাদের খারাপ ভাববে। এক পর্যায়ে তিনি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিতে বললেন। আমি বললাম, কাল সকালে আপনার বাসায় দিয়ে আসবো। তিনি আবার উত্তেজিত হয়ে বললেন এখনই দিতে। ওই সময়ে উবায়দুল হঠাৎ করেই আমার সামনের টেবিল চাপড়ে উঠে বলেন, ‘আমার জন্য কেন সুপারিশ করবে না, দিবে না কেন, আমরা তোমার মহল্লার লোক। আমাদের জন্য না করলে কার জন্য করবে?’

শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি তাকে বার বার বলি যে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস সাংসদদের সুপারিশে ভিসা দেয় না। তার পরও উবায়দুল হক সুপারিশের জন্য পিড়াপিড়ি করতে থাকেন। টেবিল চাপড়ানো দেখে আশেপাশের লোকজনও বলে উঠে কে এ লোক যে শামীম ওসমানকে ধমক দেয়। আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠেন রুমে থাকা অন্যরা। তারা অনেকটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন উবায়দুল এর দিকে। টেবিল চাপড়ানো ওবায়দুল পরে গ্রেফতার করলেও সে জামিনে রয়েছেন। আমি বার বার সিআইডি ও পুলিশকে বলেছিলাম। তারা বলেছিল যে নজরদারীতে আছে। কিন্তু কখনো তাকে দেখলাম না। পরে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পরই ঘটলো বিস্ফোরণের ঘটনা।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পরেই আমি পুলিশকে অনুরোধ করেছিলাম ওবায়দুলের বাড়িতে যেতে এবং পাসপোর্ট রয়েছে কিনা চেক করতে। তদন্তে দেখলো পাসপোর্ট নেই। পরে পুলিশ ওবায়দুলকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এর পরেই স্বজনেরা থানায় গিয়ে হৈ চৈ করে। ওই সময় পুলিশও দ্বিধায় ছিল এ বৃদ্ধ মানুষ এই কাজ কেন করবে। কাজটা ঠিক হলো কিনা। রাতে ওসি বেরিয়ে গেলেন কিন্তু ওবায়দুল সাহেবের পরিবার সারারাত ছিল। পরদিন সকালে ওসি থানায় গিয়ে দেখে ড্রয়ারের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্লাস্টিকের বোমা। সারাদেশে পরে যে ৬৩ জেলায় বোমা হামলায় হয়েছিল তার সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল।’

তিনি বলেন, রক্ত কত গরম তা অনুভব করেছিলাম। বোমাটি যখন বিস্ফোরণ হল তখন মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। আমার আশেপাশে কারো ছেড়া হাত, পা বা কারো মাথা। সিলিং ঝুলে আছে ছিন্ন ভিন্ন মানবদেহ। আর চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। পরক্ষণেই জ্ঞান হারাই। আমি প্রথম জঙ্গীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম শেখ হাসিনাকে বাঁচান। আমার ওপর হামলার পরেই কিন্তু ২১আগস্ট নেত্রীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়। সমস্যাটা হলো আমি আগে বলি পরে সবাই বুঝতে পারে।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার পরে তো আমার ধারণা ছিল আমি মরে গেছি। কিন্তু আমার বুকে আল্লাহপাকের একটি কালাম ছিল। সেটা যখন ছুয়েছিলাম তখন বুঝেছি যে মরি নাই।’

আদালত থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমকে শামীম ওসমান বলেন, ‘১৬ জুনের ঘটনায় আমি ছিলাম প্রধান ভিক্টিম। প্রধান ভিক্টিম হিসেবে আমার যে সাক্ষ্য নেয়া হয়েছিল, আমি দেখলাম তার সাথে ঘটনার কোনো মিল নাই। ঘটনার পরে আমি সাক্ষ্যতে যে জবানবন্দী দিয়েছিলাম এখন দেখি বিচার চলাকালে সেই কথা কিছুই নাই। আমাদের বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে।

ফলে আমি চাই এ ঘটনায় যারা প্রকৃত দোষী তাদের যেন বিচার হয়। আমি আদালতের কাছে অনুরোধ করেছি যিনি মামলা তদন্ত করেছেন তাকে আদালতে তলব করা হোক। আমরা এ মামলার অধিকতর তদন্ত চেয়েছি। যিনি দোষী না তিনি যেন আমার প্রতিপক্ষ হলেও যেন সাজা ভোগ না করে। এ মামলায় অনেকের নাম আছে যারা অপরাধী না। যারা প্রকৃত অপরাধী তারা এ মামলা থেকে সেভ হয়ে গেছে। আদালত আমার বক্তব্য শুনে কনভেন্স হয়েছেন। আদালত পরে ওই আদালতের এপিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন পিটিশন দেওয়ার জন্য।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘আগে যে তদন্ত হয়েছে সেই তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার বক্তব্য ঠিকমত তুলে ধরেনি। আমি কোন সমঝোতা করবো না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিকে, পার্টির সাধারণ সম্পাদককে বলেছি আমি এ চার্জশীট মানি না। আমি যদি বেঁচে নাও থাকি এই মামলাটা যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। যারা সত্যিকারের দোষী লোক তাদের যেন বিচার হয় এবং যারা নিরাপরাধ সে বিএনপি, জাতীয় পার্টি যাই করুক তাদের যেন কোনো বিচার না হয়। তাহলে সাজাপ্রাপ্ত হবে সংবিধান, সাজাপ্রাপ্ত হবে আইন, সাজাপ্রাপ্ত হবে আমাদের বিবেক, আমাদের ঈমান।’

এ মামলার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তভোগী তিনজনের একজন নারায়ণগঞ্জের-৪ আসনের সংসদ সদস্য একে এম শামীম ওসমান যাকে আদালত সাক্ষী দেওয়ার জন্যই তিন বার সমন জারি করেন। শেষ সমনে গত ২৩ মার্চ সাক্ষ্য দেয়ার নির্ধারিত তারিখ থাকলেও করোনার জন্য উপস্থিত হতে পারেননি। ফলে আবারও পিছিয়ে যায় মামলার প্রক্রিয়া।

সোমবার দুপুরে নির্ধারিত শুনানীর সময়ে আদালতে হাজির হন শামীম ওসমান। ওই সময়ে আদালতে মামলার আসামী শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভোট ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ রহমান, ভারতের দিল্লী কারাগারে আটক সহোদর আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকুকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মুফতি হান্নানের একটি মামলায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। মোরসালিন ও মুত্তাকিন ভারতে পলাতক রয়েছে। আর অভিযুক্তদের মধ্যে জামিনে থাকা কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ও ওবায়দুল্লাহ রহমান জামিনে আছেন।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া শহীদ মিনারসংলগ্ন আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২০ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন। এ ঘটনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় সাক্ষ্য দিলেন শামীম ওসমান।