কারবালায় ইমাম হোসাইনের শরীরে ৩৩টি তীর ও ৪৩টি তরবারির আঘাত হয়েছিলো

জোরআ ইবনে শরিফ ইমাম হোসাইনের বাঁ হাতে আঘাত করল। তারপর পাশে তরবারি চালাল। সিনান ইবনে আনাস এসে বর্শা মারল। ইমাম মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সিনান আরেক লোককে নির্দেশ দিল, মাথা কেটে ফেল। কিন্তু ওই লোকের সাহসে কুলাল না। সে বলল, তোর হাত নষ্ট হয়ে যাক। এই বলে সে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ইমাম হোসাইনের মাথা কেটে দেহ থেকে পৃথক করে ফেলল।

জাফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী বর্ণনা করেছেন, নিহত হওয়ার পর দেখা গেল ইমাম হোসাইনের শরীরে ৩৩টি তীর ও ৪৩টি তরবারির আঘাত রয়েছে। অবশেষে ইমাম হোসাইন তৃণগুল্মহীন এক শুষ্ক প্রান্তরে এসে শিবির স্থাপন করলেন। স্থানটি নদী থেকে একটু দূরে অবস্থিত ছিল। নদী ও প্রান্তরের মধ্যে ছিল পার্বত্য এলাকা। স্থানটির নাম জিজ্ঞেস করে জানা গেল ‘কারবালা’। ইমাম হোসাইন বললেন, কারব (যাতনা) ও বালা (বিপদ)। এটা ৬১ হিজরির ২ মহররমের ঘটনা। (আল-ইমামাহ ওয়া আস-সিয়াসাহ)

দ্বিতীয় দিন আমর ইবনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস চার হাজার কুফাবাসী সৈন্য নিয়ে এসে পৌঁছলেন। আমর এই অভিযানে আসতে চাচ্ছিলেন না। একাধিকবার তিনি এই মহাপরীক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ তাকে জোর করে পাঠিয়েছিল। আমর ইবনে সাদ কারবালায় পৌঁছে দূত পাঠিয়ে ইমাম হোসাইনকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এখানে কেন এসেছেন? তিনি বললেন, ‘অগুনতি পত্র ও দূত মারফত তোমরা আমাকে আহ্বান করেছ। এখন আমার আগমন তোমাদের পছন্দ না হলে আমি ফিরে যেতে প্রস্তুত আছি।’

ইমাম হোসাইনের জবাব শুনে আমর ইবনে সাদ সন্তুষ্ট হলেন। তিনি ভাবলেন, হয়তো সহজেই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবেন। তিনি চিঠি লিখে ইবনে জিয়াদকে এ কথা জানিয়ে দিলেন। চিঠি পড়ে সে বলতে লাগল, হোসাইনকে বলো, প্রথমে তিনি যেন সপরিবারে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার হাতে আনুগত্যের শপথ করেন। তারপর আমরা তার সম্পর্কে ভেবে দেখতে পারি। হোসাইনের শিবিরে যেন একফোঁটা পানিও পৌঁছতে না পারে। যেমন হজরত উসমান পানি থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

নিরুপায় হয়ে আমর ইবনে সাদ পানির ঘাটে পাঁচশ সৈন্য মোতায়েন করলেন। ইমাম হোসাইনের শিবিরে পানি বন্ধ হয়ে গেল। তিনি তার ভাই আব্বাস ইবনে আলীকে ত্রিশজন অশ্বারোহী ও বিশজন পদাতিকসহ পানি আনতে নির্দেশ দিলেন। আব্বাস পানির ঘাটে পৌঁছলে প্রতিরোধকারী বাহিনীর সেনাপতি আমর ইবনে হাজ্জাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বিশ মশক পানি সংগ্রহ করতে সমর্থ হলেন।

ইমাম হোসাইন সাদ ইবনে আমরের সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাৎ করেন। তিনি তিনটি প্রস্তাব পেশ করেন : ১. আমাকে যেখান থেকে এসেছি সেখানে ফিরে যেতে দাও। ২. স্বয়ং ইয়াজিদের সঙ্গে আমাকে বোঝাপড়া করতে দাও। ৩. অথবা আমাকে মুসলমানদের কোনো লোকালয়ে পাঠিয়ে দাও। সেখানকার লোকদের যে পরিণাম হয় আমারও তাই হবে।

এই প্রস্তাবের সংবাদ পত্র মারফত ইবনে জিয়াদকে জানানো হলো। ইবনে জিয়াদ প্রস্তাব মেনে নিতে চাচ্ছিল; কিন্তু শিমার বাধা হয়ে দাঁড়াল। সে বলল, সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত হোসাইনকে ছেড়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। তিনি শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে আসতে পারেন। ইবনে জিয়াদ শিমারের যুক্তি মেনে নিল এবং তাকে চিঠিসহ পাঠাল।

চিঠির বক্তব্য ছিল এরূপ: ‘হোসাইন সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করলে তাকে ছেড়ে দিও। অন্যথায় যুদ্ধ ব্যতীত গত্যন্তর নেই।’ শিমারকে মৌখিক নির্দেশ দিল, ‘আমর আমার নির্দেশ ঠিকমতো পালন করলে তাকে সরিয়ে দিয়ে তুমিই সেনাবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং হোসাইনের মাথা কেটে আমার কাছে নিয়ে আসবে।’

শত্রু সৈন্যদের মধ্য থেকে শিমার আশ্বারোহণ করে বের হলো। ইমাম বাহিনীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করে এসে বলতে লাগল, ‘হে হোসাইন, কেয়ামতের আগেই তুমি আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ।’ হোসাইন জবাব দিলেন, ‘হে রাখাল সন্তান, তুই-ই আগুনের বেশি যোগ্য।’ মুসলিম ইবনে আওসাজা বললেন, ‘আমাকে অনুমতি দিন, তির নিক্ষেপ করে পাপিষ্ঠকে শেষ করে দিই।’

ইমাম হোসাইন নিষেধ করে বললেন, ‘না না, আমি প্রথম যুদ্ধ করতে চাই না।’ (ইবনে জারির)। শত্রুবাহিনী একেবারে নিকটবর্তী হলে ইমাম হোসাইন একটি উটনীর ওপর দাঁড়িয়ে কোরআন সামনে রেখে বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। ‘লোকসকল, আমার কথা শোনো, তাড়াহুড়া করো না। আমাকে কিছু বলতে দাও। আমার কৈফিয়ত বর্ণনা করতে দাও। যদি আমার কৈফিয়ত গ্রহণযোগ্য হয় এবং তোমরা যদি তা গ্রহণ করে আমার বিরুদ্ধে শত্রুতা থেকে বিরত হও, তবে তা তোমাদের পক্ষে সৌভাগ্যের বিষয় হবে।

আর যদি আমার কৈফিয়ত যোগ্য বলে গ্রহণ করতে না পার বা ন্যায়বিচার করতে না চাও, তাহলে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। তোমরা সবাই মিলে তখন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। আমাকে সামান্য সময় না দিয়েই সবাই আক্রমণ করো। আমি সর্বাবস্থায় শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি। তিনি সৎকর্মশীলদের তত্ত্বাবধায়ক।’ এই বক্তৃতার পর হুর ইবনে ইয়াজিদ আমরের দল ত্যাগ করে হোসাইনের দলে যোগ দিল এবং তার কৃতকর্মের অনুতপ্ত হলো। কারণ সেই পেছনে পেছনে থেকে হোসাইনকে কারবালায় নিয়ে এসেছে।

এই ঘটনার পর আমর ইবনে সাদ ধনুক উঠিয়ে ইমাম বাহিনীর প্রতি তির নিক্ষেপ করল। বলল, তোমরা সাক্ষী থেক আমিই সর্বপ্রথম তির নিক্ষেপ করেছি। তারপর ব্যাপকভাবে তির নিক্ষেপ শুরু হলো। কিছুক্ষণ তিরবৃষ্টি হওয়ার পর জিয়াদ ইবনে আবিহ, আবদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের গোলাম ইয়াসার ও সালেম ময়দানে এসে ইমাম বাহিনীকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করল।

ইমাম শিবির থেকে হাবীব ইবনে নাজ্জার এবং বারীর ইবনে হাজবীর বের হতে চাইলেন; কিন্তু ইমাম হোসাইন তাদের বের হতে নিষেধ করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া কালবী দাঁড়িয়ে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। হোসাইন বললেন, তুমি নিঃসন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি, তুমি যেতে পার। আবদুল্লাহ সামান্যতেই শত্রুশিবিরের উভয় মল্লযোদ্ধাকে হত্যা করে ফেললেন। তার স্ত্রী লাঠি হাতে শিবিরের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। স্বামীকে বিজয়ী হতে দেখে ময়দানের দিকে ছুটে চললেন। হোসাইন এই বীর নারীকে বিরত করে বললেন, ‘আল্লাহ আহলে বাইতের পক্ষ থেকে তোমাকে এর প্রতিফল দান করুন; তবে স্ত্রীলোকদের জন্য যুদ্ধের ময়দান নয়।’

মল্লযোদ্ধাদের নিপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইবনে সাদের দক্ষিণভাগের রক্ষীদল ইমাম বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে দিল। ইমাম বাহিনী হাতে বর্শা উঠিয়ে নিল এবং অটল থাকল। তাদের এই দৃঢ়তার সামনে শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনী অগ্রসর হতে পারল না। নিরুপায় হয়ে ফিরে যেতে লাগল। ইমাম বাহিনী এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করল। শত্রুদের কয়েকটি লোক হতাহত হলো।

দেখতে দেখতে তুমুল যুদ্ধ বেধে গেল। উভয়পক্ষ থেকে দু-একজন করে বীর বের হয়ে আসতে লাগল এবং পরস্পরের মধ্যে অস্ত্রের বাহাদুরি দেখাতে লাগল। কিন্তু শত্রুদের যে কেউ ইমাম বাহিনীর সামনে আসছিল, তরবারির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। এই অবস্থা দেখে শত্রুপক্ষের অন্যতম সেনাপতি আমর ইবনে হাজ্জাজ চিৎকার করে বলতে লাগল, মূর্খের দল, কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছ বুঝতে পারছ না?

তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে তাদের সামনে গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না। এভাবে আর কেউ অগ্রসর হয়ো না। তারা মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রাণী, পাথর নিক্ষেপ করলেই মিসমার হয়ে যাবে। এই যুক্তি আমর ইবনে সাদের মনে ধরল। তিনি বিক্ষিপ্ত আক্রমণ বন্ধ করে ব্যাপকভাবে যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দিলেন।

শত্রুসৈন্য চারদিক থেকে পঙ্গপালের মতো ইমাম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর আক্রমণের তীব্রতা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলে দেখা গেল ইমাম বাহিনীর বিখ্যাত বীর মুসলিম ইবনে আওসাজা আহত হয়ে ভূমিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। তখনও তার দম অবশিষ্ট ছিল। ইমাম হোসাইন ছুটে গিয়ে তার কাছে পৌঁছলেন। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, ‘মুসলিম, তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক।’ মুসলিমই ইমাম বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম শহীদ।

শত্রুদের দ্বিতীয় আক্রমণ শুরু হলো শিমারের নেতৃত্বে। ইমাম বাহিনীর পক্ষ থেকে মাত্র বত্রিশজন অশ্বারোহী প্রতিরোধ করতে দাঁড়ালেন। শত্রুরা তাদের সামনে টিকে থাকতে না পেরে আরও পাঁচশ তিরন্দাজ এনে দাঁড় করাল এবং আক্রমণ তীব্রতর করল। চারদিকের তিরবৃষ্টির মধ্যে ইমাম বাহিনীর ঘোড়াগুলো অচল হয়ে পড়ল। অশ্বারোহী সৈন্যরা নিরুপায় হয়ে পদাতিকরূপে ময়দানে অবতরণ করতে বাধ্য হলেন।

ভীষণ গতিতে যুদ্ধ চলছিল। দুপুর গড়িয়ে গেলেও শত্রু বাহিনী বিজয়ী হতে পারছিল না। কারণ, ইমাম বাহিনী তাঁবুকে কেন্দ্র করে একস্থানে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। এবার শত্রুরা তাঁবুতে আগুন জ্বালিয়ে দিল। ইমাম বাহিনী অস্থির হয়ে উঠল। হোসাইন বললেন, ‘তাঁবু জ্বালিয়ে দাও। এতে আমরা আরও একত্র হয়ে প্রতিরোধ করতে সুযোগ পাব।’

কিন্তু পর্বতপ্রমাণ শত্রুব্যূহের সামনে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আর কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে। ইমাম বাহিনীর অনেকেই শাহাদতের পেয়ালা পান করলেন। কুফার বিখ্যাত বীর আবদুল্লাহ ইবনে উমায়ের নিহত হলেন। তার বীর পত্মী উম্মে ওয়াহাবও স্বামীর সঙ্গে শহীদ হলেন। ইমাম বাহিনীর ওপর চরম সংকট নেমে আসছিল। দেখতে দেখতে অন্যতম সেনাপতি হাবীব ইবনে নাজ্জারও নিহত হলেন। হাবীবের পর মহাবীর হুর ইবনে ইয়াজিদ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে শত্রুব্যূহে প্রবেশ করলেন, আর ফিরে এলেন না।

দেখতে দেখতে জোহরের সময় শেষ হয়ে এলো। ইমাম হোসাইন মুষ্টিমেয় সঙ্গী নিয়ে নামাজ আদায় করলেন। নামাজের পর শত্রুদের আক্রমণ আরও তীব্র হলো। জোহাইর ইবনে কাইয়েন বীরত্বগাথা গেয়ে ময়দানে অবতরণ করলেন। তিনি শত্রুব্যূহে প্রবেশ করে তাদের নিপাত করতে করতে শাহাদত বরণ করলেন। ধীরে ধীরে ইমাম বাহিনী নিঃশেষ হয়ে আসছিল। অবশিষ্টরা সিদ্ধান্ত নিলেন, একে একে লড়াই করে ইমাম হোসাইনের সামনেই প্রাণ বিলিয়ে দেবেন। তাদের সবাই একে একে বিদায় গ্রহণ করলেন। এবার বনি হাশেম ও নবী বংশের পালা এলো।

সর্বপ্রথম ইমাম হোসাইনের পুত্র আলী ময়দানে অবতীর্ণ হলেন। মুখে বলছিলেন, ‘আমি আলী ইবনে হোসাইন ইবনে আলী, কাবার প্রভুর শপথ, আমি নবী করিম (সা.) এর নৈকট্য পাওয়ার অধিক হকদার। আল্লাহর শপথ, পিতৃপরিচয়হীন ব্যক্তিরা আমাদের ওপর রাজত্ব করতে পারবে না।’ তিনি যুদ্ধ করতে করতে মুররা ইবনে মালকাজ নামক এক দুর্বৃত্তের আঘাতে শহীদ হন।

কাসেম ইবনে হাসান ইবনে আলীও যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। এ অবস্থায় ইমাম হোসাইনের এক পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। তাঁবুর ভেতর থেকে সদ্যোজাত শিশুটিকে এনে তার কোলে দেওয়া হয়। তিনি তার কানে আজান দিচ্ছিলেন। এ সময় একটি তীর এসে শিশুর কণ্ঠনালিতে বিঁধে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। (ইবনে জারির)

সব শেষে ইমাম হোসাইনের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু হলো। তিনি ভীষণ বেগে তরবারি চালাচ্ছিলেন। তিনি যেদিকে যাচ্ছিলেন শত্রুসৈন্যরা কাতারের পর কাতার পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘক্ষণ এ অবস্থা চলল। এ সময় ইমাম হোসাইনের বোন হজরত জয়নাব চিৎকার করতে করতে তাঁবু থেকে বের হলেন। তিনি বলছিলেন, হায়, আকাশ যদি মাটিতে ভেঙে পড়ত! এরই মধ্যে আমর ইবনে সাদ ইমাম হোসাইনের একেবারে কাছে পৌঁছে গেলেন।

জয়নাব বললেন, আমর, আমার ভাই কি তোমার সামনে নিহত হয়ে যাবেন? আমর মুখ ঘুরিয়ে নিলেন; তার গাল ও দাড়ি চোখের পানিতে ভেজা ছিল। ইমাম হোসাইন পিপাসার্ত হয়ে পড়লেন। তিনি ফোরাতের দিকে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুরা তাকে এগুতে দিল না। একটি তির এসে তার কণ্ঠদেশে বিঁধল। তিনি ফোরাতের পথ ছেড়ে তার তাঁবুর দিকে ফিরে আসতে লাগলেন। শিমার একদল সৈন্যসহ তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়াল। তিনি শিমারের কাছে তার তাঁবুটি রক্ষার আবেদন জানালেন। সে বলল, আচ্ছা, আপনার তাঁবু রক্ষা করা হবে।

সময় চলে যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ ইমাম হোসাইনকে হত্যা করে মহাপাপ কাঁধে নিতে চাচ্ছিল না। শিমার চিৎকার করে উঠল, ‘দেরি করছ কেন? শেষ কাজ শেষ করে ফেলছ না কেন?’ আবার চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু হলো। জোরআ ইবনে শরিফ ইমাম হোসাইনের বাঁ হাতে আঘাত করল। তারপর পাশে তরবারি চালাল। সিনান ইবনে আনাস এসে বর্শা মারল। ইমাম মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

সিনান আরেক লোককে নির্দেশ দিল, মাথা কেটে ফেল। কিন্তু ওই লোকের সাহসে কুলাল না। সে বলল, তোর হাত নষ্ট হয়ে যাক। এই বলে সে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ইমাম হোসাইনের মাথা কেটে দেহ থেকে পৃথক করে ফেলল। জাফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী বর্ণনা করেছেন, নিহত হওয়ার পর দেখা গেল ইমাম হোসাইনের শরীরে ৩৩টি তির ও ৪৩টি তরবারির আঘাত রয়েছে। সূত্র: ‘জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ’ গ্রন্থ থেকে